আজ ১৮ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২রা আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

সফল নারী উদ্যোক্তা যিনি তিন মাসে ২৩ লক্ষ টাকার চাঁদপুরের ইলিশ এবং নদীর মাছ বিক্রি করেছেন

ব্যবসায় প্রশাসনে পড়ালেখা শেষ করার পর সব সময় ইচ্ছে ছিল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে বাস্তব জীবনে কাজে লাগিয়ে একদিন একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দাঁড় করানোর। তবে  সংসার, চাকরি, পড়ালেখা সবকিছু সামলে সেভাবে ব্যবসায় ঢোকা সম্ভব হচ্ছিল না জেরিন হান্নানের।

এরইমধ্যে হাজবেন্ডের চাকরিসূত্রে চাঁদপুর চলে আসেন ২০১৮তে। চাঁদপুরের ইলিশ কিংবা পদ্মার ইলিশের কথা সারাজীবন শুনে থাকেলও চাঁদপুরে এসেই চর্মচক্ষে এই ব্যাপারটি প্রত্যক্ষ করেছিলেন জেরিন! বিশাল পদ্মা-মেঘনায় হাজার হাজার জেলে লক্ষ লক্ষ টন ইলিশ আহরণ করছে, রাতভর মাছ ধরে সেগুলো মাছঘাটে নিয়ে আসছে, আড়তগুলোতে নিলাম হচ্ছে, অসংখ্য ট্রাকে চেপে সেই মাছ সারাদেশে বিভিন্ন বাজারে চলে যাচ্ছে – এই এক মহাযজ্ঞ!

পুরো ব্যাপারটি প্রত্যক্ষ করে জেরিন ভীষণ রোমাঞ্চিত হলেন! এখান থেকেই ধীরে ধীরে মাছ নিয়ে কাজ করার একটি আগ্রহ তৈরি হলো জেরিনের। আরো কিছুদিন যাওয়ার পরে বুঝতে পারলেন অনেক সেক্টরেই নারী উদ্যোক্তারা বেশ সফলতার সাথে কাজ করলেও কেন যেন মাছ নিয়ে কোন নারী উদ্যোক্তা কে সেভাবে কাজ করতে দেখা যায় না! কারণটা সম্ভবত অত্যধিক পচনশীল এবং ঝামেলাপূর্ণ ডেলিভারি সিস্টেম এর  কারণে।

Advertisements

এই চ্যালেঞ্জটাকেই একটি অপরচুনিটি হিসেবে দেখ্লেন জেরিন, যেহেতু কোনো নারী উদ্যোক্তা এই সেক্টরে নেই তাই ভ্যাকুয়ামটা পূরণ করার জন্য এগিয়ে আসবেন বলে ঠিক করলেন। তার ওপর আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস নজরে এলো। আমাদের দেশে অনেক পণ্যের ব্র্যান্ডিং হয়েছে এমনকি লবণ পর্যন্ত আমাদের এখন ব্র্যান্ডিং হয়েছে, এখনো যে পণ্যটির সেভাবে ব্র্যান্ডিং হয়নি সেটি হচ্ছে মাছ!

এটিও একটি বিশাল অপরচুনিটি বলে মনে হলো জেরিনের কাছে। এভাবেই ১ লা জুন জেরিনের অনলাইন শপের যাত্রা শুরু হলো! মাছের হাট বাজার নাম দিয়ে ফেইসবুক একটি পেজ খুলে ফেললেন। বেশকিছু জেলেদের সাথে চুক্তি করলেন, আড়তদারদের  সাথে কথা বললেন, কর্মচারী নিয়োগ করলেন, নিজস্ব ডেলিভারি ম্যান এবং ট্রান্সপোর্ট এর ব্যবস্থা করলেন এবং সর্বশেষ নিজের প্রতিষ্ঠানের নামে ট্রেড লাইসেন্স নিলেন!

সময়টা ছিল করোনা মহামারীর মধ্যে। লোকজন বাজার ঘাট কিংবা কাঁচাবাজারে যাওয়াটা ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছিল এবং সরকারিভাবেও এগুলো এড়িয়ে চলার জন্য বারং বার অনুরোধ করা হচ্ছিল। মহামারীর এই ঝুঁকিপূর্ণ সময়টাও ব্যবসার জন্য একটি বড় অপরচুনিটি হিসেবে দেখা দেয়! অনলাইন অর্ডার কিংবা হোম ডেলিভারি আগে থেকে জনপ্রিয় ছিল তবে করণা মহামারীর সময় লোকজন আরো বেশি হোম ডেলিভারি এবং অনলাইন অর্ডার এর দিকে ঝুঁকে পড়ে। এই সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে ফেসবুক পেইজকে হাজারো গ্রাহকের মাঝে ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন জেরিন এবং নদীর টাটকা তাজা মাছ দিনে দিনে চাঁদপুর থেকে বাংলাদেশের সকল জেলা শহরে ডেলিভারি হচ্ছে যা এটি অসংখ্য গ্রাহকের কাছে ছিল একেবারেই অবিশ্বাস্য একটা ব্যাপার!

তার চেয়েও বড় অবাক করা ব্যাপার ছিল আস্ত মাছ হোম ডেলিভারি হচ্ছে dhaka-chittagong-sylhet এবং চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোতে! এরকম বেশ কিছু নতুনত্ব এবং অভাবনীয় ব্যাপার যেগুলো অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ছিল সেগুলোকে জেরিন ম্যানেজ করেছেন অত্যন্ত সফলতার সাথে এবং পেশাদারিত্বের সাথে।

জেরিন মনে করেন, তার পেজটি বা প্রতিষ্ঠান অন্যদের চেয়ে একটি জায়গায় একেবারেই ভিন্ন। ফেসবুকে মাছ নিয়ে আরও বেশ ক’টি পেইজ কাজ করে, তবে জেরিনের পেজটি শুধুমাত্র চাঁদপুরের ইলিশ এবং নদীর মাছ নিয়ে কাজ করে। বেশকিছু গ্রাহকের কমপ্লেইন থাকার কারণে ফিফটি পার্সেন্ট থেকে শুরু করে পুরো অর্ডারের মাছ বিনামূল্যে রিপ্লেস করেছেন, অনেক সময় এডভান্স এর টাকা রিটার্ন করেছেন! বাংলাদেশের কোন ট্রেডিশনাল কাঁচাবাজারের মাছ ব্যবসায়ী এই লেভেলের সার্ভিস গ্রাহককে দিবেন বলে মনে হয় না।

     এই বিভাগের আরও খবর দেখুনঃ