আজ ১৩ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

শিঙ্গায় ফুৎকার দিলেই জলাশয়ে নামে সবাই

শিঙ্গায় ফুৎকার দিলেই জলাশয়ে নামে সবাই

গাইবান্ধার গ্রামাঞ্চলে এখন চলছে মাছ ধরার মৌসুম। সেই সঙ্গে খাল-বিল, জলাশয়েও শুরু হয়েছে ঐতিহ্যবাহী দলবদ্ধ মাছ শিকার ‘বৈদ’ বা ‘বৈত’ উৎসব।

সোমবার সদর উপজেলার খোলাহাটি ইউপির ঝিনিয়ার বিল ও কুপতলা ইউপির নলিগলির বিলে মাছ শিকারের মধ্য দিয়েই এবার ‘বৈদ’ উৎসব শুরু হয়েছে। কর্মব্যস্ত মানুষের জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া এ উৎসবে অংশ নেন বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ। এসব মানুষের হাতে, কাঁধে বিভিন্ন ধরনের মাছ ধরার উপকরণ পলো, হ্যাংগার জালি, পলো জালি, হ্যাগা, মুঠ জাল, কোঁচ, ক্যাটা, তৌরা জাল, ঝাঁকি জাল ছিল।

পেশায় কম্পিউটার ব্যবসায়ী আতোয়ার রহমান। কাজে যাওয়ার আগে পলো নিয়ে নেমে পড়েন বিলে। ভাগ্যক্রমে তিনি পেয়েছেন মাঝারি আকারের দুটি কার্প মাছ। হাসি দিয়ে তিনি বলেন, এ দলে কম করেও তিন-চারশ মানুষ আছেন। শিক্ষক, সরকারি কর্মচারী, ব্যবসায়ী, ছাত্র, কৃষক সবাই মিলেমিশে মাছ ধরছেন। তাদের কারো কারো বয়স ৬৫ ছাড়িয়ে গেছে।

Advertisements

এলাকার সুযোগ সন্ধানী ‘বৈদ’ শিকারি নামে পরিচিত হালিম মিয়া তখন পর্যন্ত ‘সাইত’ করতে পারেননি। তিনি বলেন, দুই বিলে নামতে নামতে মাছের সংখ্যা প্রায় হাজার হয়ে যাবে। কেউ ২০ থেকে ২৫টি মাছ পাবে, আবার কাউকে শূন্য হাতে ফিরতে হবে।

প্রবীণ শিক্ষক ফেরদৌস বলেন, কোন কাল থেকে এ অঞ্চলে বৈদ নামের এ মাছ ধরা চলছে তা বলা কঠিন। বৈদ নামে প্রকৃত অর্থ কি তা-ও জানা নেই। সাধারণত কার্তিক মাসের প্রথমদিক থেকে শুরু করে মাঘ মাস পর্যন্ত যখন বড় বড় বিল, নদী ও খালে পানি কম থাকে তখনই এ দলবদ্ধ বৈদ নামের মাছ ধরার প্রকৃত মৌসুম।

জেলার ছয়টি উপজেলাতেই রয়েছে পৃথক সৌখিন এ মাছ শিকারির দল। বৈদ দলের আলোচনার ভিত্তিতে মাছ শিকারের নির্দিষ্ট জলাশয়, তারিখ, সময়, যাত্রার স্থান নির্ধারণ করে গ্রামের হাট-বাজারে ঢোল পিটিয়ে জানিয়ে দেয়া হয়। এ বৈদের দলের একজন দলনেতা থাকেন। যার কাছে থাকে মহিষের শিং দিয়ে তৈরি বড় একটি বাঁশি। যাকে বলা হয় বৈদের শিঙ্গা। যা দিয়ে বিউগলের মতো উচ্চস্বরে শব্দ বের হয় এবং অনেক দূর থেকে তা শোনা যায়।

নির্ধারিত স্থানে যথাসময়ে শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হয় বার বার। আর শিঙ্গার আহ্বানে নিজ নিজ পছন্দমতো মাছ ধরার নানা সরঞ্জাম নিয়ে সমবেত হতে থাকেন মৎস্য শিকারিরা। পূর্বনির্ধারিত বিল জলাশয়ে দলবদ্ধ হয়ে মাছ শিকার চলে দিনভর। এতে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, যে কেউ এতে শামিল হতে পারেন।

বৈদে এক জলাশয় থেকে অন্য জলাশয়ে মাছ মারা চলে সকাল থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। এতে অনেক মাছ পান আবার অনেকে একটি মাছও পান না। কিন্তু এতে বৈদ শিকারিদের কোনো দুঃখ নেই। কেননা এখানে দলবদ্ধভাবে মাছ ধরতে যাওয়ার আনন্দটাই মুখ্য, মাছ পাওয়া মূল বিষয় নয়।

     এই বিভাগের আরও খবর দেখুনঃ