আজ ১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৫ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

‘মা, তুমি ভাত খেয়ে ঘুমাও আমি নামাজে যাই’

‘মা, তুমি ভাত খেয়ে ঘুমাও আমি নামাজে যাই’

রাজধানীর শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের নিচের ফ্লোরে অসহায়ের মতো হাটছেন বুলবুলি বেগম। সামনে যাকে পাচ্ছেন, তারই হাত-পায়ে ধরছেন আর বলছেন, ‘আমার ছেলের লগে দেখা করায় দেন। হেই বাইচা আছে নাকি মইরা গেছে এইটুকুন কন। আমার এই কথাটুকুন রাকেন আপনারা।’

শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সকালে হাসপাতালের অভ্যর্থনা কক্ষে বসে মা বুলবুলি বেগম বলেন, ‘আমাকে এশার নামাজের আগে নয়ন ফোন দেয়। বলে, মা আপনি ভাত খেয়ে ঘুমান। আমি মসজিদে গেলাম। এরপর আর কথা হয়নি।’

মসজিদে বিস্ফোরণে নয়ন দগ্ধ হয়েছেন এমন খবর তার মাকে ফোন করে বলেন নয়নের এক বন্ধু। নয়নের মা রাতেই লালমনিরহাট থেকে রওনা দিয়ে সন্তানের খোঁজে ঢাকায় আসেন। তবে সন্তানের দেখা পাননি। সন্তান শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের আইসিইউতে ভর্তি। আর মা হাসপাতালের অভ্যর্থনা কক্ষে আহাজারি করছেন।

Advertisements

বুলবুলি বলেন, ‘আমার ছেলে নয়ন (২৬)। নারায়ণগঞ্জের মডেল গ্রুপ গার্মেন্টসের স্যাম্পল সুপারভাইজর হিসেবে কাজ করতো। আমার স্বামী গত ১৫/১৬ বছর ধইরা মানুষিক রোগী। আমার তিন পোলা, এক মাইয়া। বড়ডা হইলো নয়ন। মেয়ের বিয়া দিয়া দিছি। বাকি দুই পোলা ছোট। মাদ্রাসায় পড়ে।’

‘পুরা সংসারের দায়িত্ব আমার নয়নের উপরে। ১৩ বছর বয়সে ঢাকায় আইসা কাজ করতে। ছেলেরে কতো বলছি বিয়া কর, বিয়া কর। ছেলে আমার বিয়া করে নাই। শুনছি শরীরের সব নাকি পুইরা গেছে। এখন কেডাই করবো বিয়া আমার পোলারে,’ যোগ করেন বুলবুলি।

রাত ৯ টায় ছেলের বন্ধুদের ফোন পেয়ে রাতের গাড়িতেই ঢাকা আসেন বুলবুলি। অপেক্ষায় আছেন ছেলেকে এক নজর দেখার জন্য। বুলবুলি বলেন,‘ নামাজে যাওয়ার আগে আমারে ফোন দিছিল। আমি খাইছি কিনা জিগাইলো। কইলো আমনে খাইয়া নেন। আমি নামাজ পইড়া আসি।’

নয়নের বন্ধু বলেন, ‘মসজিদেরই একটা মেসে আমি আর নয়ন থাকতাম। আমি অল্পের জন্য বেচে গেছি। আমি গেছিলাম শপিং এ। নয়ন ফোন দিয়া জিজ্ঞেস করছিলো আমি কখন আসুম৷ বললাম ৯ টা বাজবো৷ বললো, তাইলে নামাজ থেকে ফেরার পথে একবারে খাইয়া ঢুকুমনে। এমনিতে আমরা দুজনে একসাথেই নামাজে যাই। কাল আমি শপিং এ যাওয়াতে আর যাওয়া হয়নাই। নয়তো আমিও আজ বার্ন ইউনিটে ভর্তি থাকতাম।’

শুক্রবার রাত পৌনে ৯টার দিকে নারায়ণগঞ্জে সদর উপজেলার ফতুল্লা থানার পশ্চিম তল্লা এলাকার বাইতুছ সালাত জামে মসজিদে এশার নামাজ শেষে মোনাজাত চলাকালে বিস্ফোরণ হয়। এতে ওই মসজিদের ইমাম, মোয়াজ্জিনসহ গুরুতর দগ্ধ ৩৭ জনকে শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত এ ঘটনায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মসজিদটির ইমামসহ ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে।

এদিকে, মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায় শনিবার নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, তিতাস গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিভাগ চারটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি ইতিমধ্যেই তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে। সে কমিটিতে প্রধান করা হয়েছে অতিরিক্ত ম্যাজিস্ট্রেট খাদিজা তাহেরা ববিকে। অন্যদিকে, তিতাসের জেনারেল ম্যানেজার পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের মো.আব্দুল ওয়াহাব তালুকদারকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

জেলা প্রশাসন এবং তিতাসের দুটি কমিটিই ৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দেবে বলে জানানো হয়েছে।

এর আগে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের প্রধান সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, ‘আমাদের কাছে মোট ৩৭ জন রোগী এসেছিল। বাকি যারা ভর্তি আছেন, তাদের অবস্থাও শঙ্কামুক্ত নয়।

প্রসঙ্গত, প্রাথমিকভাবে মসজিদের ছয়টি এসি একযোগে বিস্ফোরিত হয় বলে জানা গেছে। তবে মসজিদের নিচে গ্যাসের লিক থেকেও এ বিস্ফোরণ হতে পারে বলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট ধারণা করছে

     এই বিভাগের আরও খবর দেখুনঃ