আজ ১৩ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

মারাত্মক এক রোগের উপসর্গ ঘুম, অতঃপর মৃত্যু

অজানা এক রোগ। রহস্যময়ভাবে এই রোগে যারা আক্রান্ত হয় তারাই ঘুমিয়ে পড়ে। এভাবেই একসময় আক্রান্ত রোগীরা মৃত্যুবরণ করে। এমনই এক মারাত্মক রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে ১৯১৬ সালে।

ইউরোপে তখনো চলছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। এটি একটি বৈশ্বিক যুদ্ধ। যা ১৯১৪ সালের ২৮ জুলাই ইউরোপে শুরু হয় এবং ১১ নভেম্বর ১৯১৮ পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। ৬০ মিলিয়ন ইউরোপীয়সহ আরো ৭০ মিলিয়ন সামরিক বাহিনীর সদস্য ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম এই যুদ্ধে একত্রিত হয়। এমন বিরাট যুদ্ধ তার আগে দেখেননি কেউই।

অসংখ্য যুবক প্রাণ সংশয় নিয়ে লড়াই করে যাচ্ছেন তাদের সেনাবাহিনীর হয়ে। তাদের অসীম সাহসিকতার সাক্ষী থাকছে পুরো পৃথিবী। তবে সে সময়ের চিত্র যে শুধু এমনই ছিল তা কিন্তু নয়। যুদ্ধের দামামার সঙ্গে তখন নতুন আতঙ্কে গোটা ইউরোপবাসী।
অজানা এক রোগের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো ইউরোপে। দিন দিন মহামারি আকারে পৌঁছায়। দিন দিন দীর্ঘ হচ্ছে মৃতের সংখ্যা। শুধু ইউরোপই নয়, কিছুদিনের মধ্যেই নিউ ইয়র্কেও ছড়িয়ে গেল সংক্রমণ। সেখানেও চোখের সামনে মারা যেতে থাকেন অনেক মানুষ। আর এই রোগের উপসর্গ ছিল ঘুম। ফলেই ক্রমশ আলস্যের মধ্যে চলে যাচ্ছিলেন অসংখ্য মানুষ।

Advertisements

সারা জীবন কেটে যাচ্ছিল শুধুই ঘুমের মধ্যে। ঘুমের মধ্যেই অনন্ত যাত্রার পথে চলে যাচ্ছিলেন অনেকে। ১৯১৬ সালে ভের্ডনের যুদ্ধ ফেরত এক সৈনিকের শরীরে প্রথম এই রোগটির প্রভাব দেখা যায়। সেনাবাহিনীতে কাজ করার কারণে স্বাভাবিকভাবেই তার শরীরের দক্ষতা ছিল অনেক বেশি। তবে হঠাৎ করেই এক অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা যায় তার ব্যবহারে। কোনো কাজেই যেন আর মন বসছে না। স্থির চোখে সামনের দিকে তাকিয়ে থাকছেন অথচ যেন কিছুই দেখছেন না। আর সুযোগ পেলেই ঘুমিয়ে পড়ছেন তিনি।
অনেক চেষ্টা করেও তখন সে ঘুম আর ভাঙানো যায়নি। এমন ঘটনায় তার পরিবারের লোকজন তো বটেই, চিকিৎসকরাও চিন্তিত হয়ে পড়েন। আর কিছুদিনের মধ্যেই দেখা যায়, তিনি একা নন। একই ধরনের অসুস্থতায় ভুগছেন আরো অনেক সৈনিক। আর তাদের সংখ্যাটা বেড়েই চলছিল। সবার উপসর্গই এক। আর মৃত্যুর কারণ প্রায় প্রতি ক্ষেত্রেই শ্বাসযন্ত্রের পক্ষাঘাত। রোগের উৎস খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন চিকিৎসকরা।

অনেকেই গবেষণা চালাতে থাকেন এ অজানা সংক্রমণ নিয়ে। অবশেষে ভিয়েনার এক স্নায়ুবিদ, ভন ইকোনমো এর কিছু দিক বের করতে সক্ষম হন। ভন ইকোনমো লক্ষ্য করলেন এই রোগের প্রকোপে প্রত্যেকের মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস অংশটি ক্রমশ শুকিয়ে আসছে। এর ফলেই ঘুমের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে তাদের শরীরে। সেই ঘুম যে কখন চিরনিদ্রায় পরিণত হচ্ছিল তা অনেকেই টের পায়নি।
ভনের গবেষণার জন্যই এই রোগ ‘ভন ইকোনমো’জ এনসেফেলাইটিস’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। আর ডাক্তারি পরিভাষায় এই রোগের নাম ‘এনসেফেলাইটিস ল্যাথার্জিকা’। তবে এর পরেও রোগের প্রকোপ আটকানো যায়নি। মানুষের শরীর থেকে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছিল বহু কুকুরের শরীরেও। আর ভাইরাস সম্বন্ধে তেমন কোনো ধারণাই তখনো তৈরি হয়নি। প্রায় ১৯৬০-এর দশক পর্যন্ত এই রোগের প্রকোপ চলেছিল।

এরপর অ্যান্টি-ভাইরাস ওষুধের সাহায্যেই এই রোগ সারিয়ে তোলা হয়। তবে এমন বিস্ময়কর অসুখ পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কমই এসেছে। চার দশকের বেশি সময় ধরে এটি যে কত মানুষের প্রাণ নিয়েছে তার কোনো সঠিক হিসেব নেই। এছাড়াও যুগে যুগে নানা মহামারিতে প্রাণ দিয়েছে অনেক মানুষ। তবে এমন আজব ভাইরাস বোধ হয় আর একটিও ছিল না। যার একমাত্র উপসর্গ ছিল ঘুম।

     এই বিভাগের আরও খবর দেখুনঃ