আজ ৩০শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৩ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

ভ্যাকসিন যুদ্ধে বাংলাদেশ

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ভ্যাকসিন পেতে মরিয়া বিশ্ব। ভ্যাকসিন পেতে অন্য দেশের মতো চুক্তি, ট্রায়াল, বিনিয়োগ,যোগাযোগ বাড়াচ্ছে বাংলাদেশও। চীনের ভ্যাকসিন ট্রায়ালের অনুমোদন, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের সঙ্গে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের চুক্তিতে দেশে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভ্যাকসিন পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। চলছে রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনাও। করোনামুক্ত হতে ভ্যাকসিন যুদ্ধে নেমেছে বাংলাদেশ।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, অক্সফোর্ডের গবেষকদের ভ্যাকসিন পাওয়ার প্রতিশ্রুতি পেয়েছি। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের চুক্তি হয়েছে। সরকারিভাবেও আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। গতকাল সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী আরও বলেন, রাশিয়া বাংলাদেশের ভ্যাকসিন উৎপাদনের সক্ষমতা জানতে চেয়েছে। দেশের কয়েকটি কোম্পানির সে সক্ষমতা আছে। আমরা রাশিয়ায় চিঠি পাঠিয়েছি, ভ্যাকসিনের বিষয়ে রাশিয়ান রাষ্ট্রদূতও কথা বলেছেন। চিঠি দূতাবাসের মাধ্যমে রাশিয়ার স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। রাশিয়া জিটুজি (সরকার থেকে সরকার) পদ্ধতিতে দিতে চায়, তারা বলেছে বাংলাদেশে যদি ভ্যাকসিন তৈরি করার সুযোগ থাকে তাহলে তারা এ দেশেও তৈরির জন্য অনুমোদন দিতে পারে। চীন ছাড়া এখন পর্যন্ত অন্য কোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে ভ্যাকসিনের ট্রায়ালের আবেদন করেনি। দেশে টিকা আসার পর তা মানুষের মধ্যে কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, তা নিয়েও এরই মধ্যে শুরু হয়েছে পরিকল্পনার কাজ। বর্তমান সম্প্রসারিত টিকাদান কার্যক্রম (ইপিআই) ব্যবহার করেই মাঠ পর্যায়ে টিকা প্রয়োগ করার প্রস্তুতি চলছে। চলছে এসব কাজে দক্ষ জনবল তৈরির কাজও। স্বাস্থ্য অধিদফতরের (মা ও শিশু) শাখার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, আমরা আমাদের ইপিআই কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা ও জনবলকে এবার করোনার টিকা প্রয়োগের বড় শক্তি হিসেবে মনে করছি। তবে এ জনবলকে কীভাবে করোনার টিকার জন্য দক্ষ করা হবে, সেজন্য গাইডলাইন তৈরি হচ্ছে। ওই গাইডলাইন অনুসারে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। আমরা এখনো জানি না কোন টিকা আগে পাব, সে টিকা কয় ডোজের হবে, কোন বয়সীদের মধ্যে দেওয়া যাবে। এসব বিষয় আরও পরিষ্কার হতে কিছুটা সময় লাগবে। প্রস্তুতির বিষয়ে তিনি আরও বলেন, আমরা ইতোমধ্যে একটি সফটওয়ার তৈরির কাজ শুরু করেছি, যা টিকা প্রয়োগ বাস্তবায়নে অনেক সহায়তা করবে। এ ছাড়া আমরা টিকা মজুদ, পরিবহন ও বিতরণের জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রস্তুতি যেগুলো আগেভাগে নেওয়া সম্ভব, সেগুলো নিতে শুরু করে দিয়েছি।’ স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এ বি এম খুরশিদ আলম বলেছেন, চীন থেকে আমদানি করা করোনা প্রতিরোধী ভ্যাকসিনের ট্রায়াল বাংলাদেশে শিগগিরই শুরু হবে। মানবতার সেবায় স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে যারা আসবেন, শুধু তাদেরই করোনা ভ্যাকসিন ট্রায়াল কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা হবে। জোর করে কাউকে আনা হবে না। তবে যারা এ কাজে সম্পৃক্ত থাকবেন তাদের ঝুঁকিভাতা দেওয়া হবে কিনা সে ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। গতকাল মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালের অডিটোরিয়ামে এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সূত্রে জানা যায়, কভিড-১৯ প্রতিরোধে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ পর্যন্ত ১৪১টি ভ্যাকসিন তৈরির কাজ হচ্ছে। যার মধ্যে ২৫টি হিউম্যান ট্রায়ালে রয়েছে এবং মাত্র ছয়টি ভ্যাকসিন হিউম্যান ট্রায়ালের তৃতীয় ধাপে রয়েছে। এ মাসেই আন্তর্জাতিক ভ্যাকসিন জোট (দ্য গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন্স অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন্স) গ্যাভির এ-সংক্রান্ত বোর্ড সভা হবে। সভায় কো-ফাইন্যান্সিংয়ের মাধ্যমে কতগুলো দেশকে ভ্যাকসিন দেওয়া হবে সে বিষয়টি ছাড়াও অন্য বিষয়গুলো নিশ্চিত করা হবে। এ ক্ষেত্রে স্পেশাল ইন্টারেস্ট গ্রুপ হিসেবে বাংলাদেশ প্রাথমিক পর্যায়ে ফ্রন্টলাইনারদের জন্য চাহিদার ৩ শতাংশ বা ৫১ লাখ ভ্যাকসিন পাবে। এ ছাড়া পরবর্তী সময় কয়েকটি ধাপে বাকি ২০ শতাংশ বা ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষের জন্য ভ্যাকসিন পাওয়া যাবে। সেটি সিঙ্গেল ডোজ হোক আর ডাবল ডোজ হোক। ভ্যাকসিন কেনার প্রস্তুতি রাখতে চলতি অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দকৃত ১০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যবহারের পরিকল্পনা চলছে। গ্যাভি থেকে ভ্যাকসিন পেতে যেন দেরি না হয় এজন্য প্রস্তুতি রাখছে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সঙ্গে স্বাস্থ্য, পররাষ্ট্র, অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বৈঠকে সম্প্রতি এ ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে। তবে এখনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। ভ্যাকসিন কেনার অর্থ বরাদ্দের জন্য পরামর্শ দিয়েছে জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি।

এ ব্যাপারে কমিটির সদস্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ভ্যাকসিন পাওয়ার পাশাপাশি দেশে আনার পরে কীভাবে কোথায় কোল্ড স্টোরেজে রাখা হবে তা ঠিক করতে হবে। ভ্যাকসিন আনার পরে সিরিঞ্জের টেন্ডার করে তা ফেলে রাখা যাবে না। এ কাজে অংশগ্রহকারী স্বাস্থ্যকর্মীদের তালিকা করে রাখতে হবে। নয় তো ভ্যাকসিন পাওয়ার পর হুলুস্থুল শুরু হবে। এই ভাইরাস বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ভ্যাকসিন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে স্বাস্থ্যকর্মীদের দেওয়া হয় কিন্তু এর পরে কাকে দেওয়া হবে তা নির্ধারণ করতে হবে। আমার পরামর্শ থাকবে, স্বাস্থ্যকর্মীদের পরে শিক্ষার্থী ও শ্রমিকদের দেওয়া। তাতে দেশের শিক্ষা ও অর্থনীতি সচল হবে। এরপর বয়স্ক ব্যক্তি ও ধাপে ধাপে অন্য সবাইকে দেওয়া যেতে পারে।

Advertisements

     এই বিভাগের আরও খবর দেখুনঃ