আজ ১৮ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২রা আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

ঝুঁকিতে পড়তে পারে ইন্টারনেটের নিরাপত্তা !

ঝুঁকিতে পড়তে পারে ইন্টারনেটের নিরাপত্তা !

দেশে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের ব্যবহার গত এক বছরে প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে । বর্তমানে ব্যবহার হয় এক হাজার ৭০০ থেকে এক হাজার ৭৫০ জিবিপিএস। করোনাকালে যার চাহিদা ছিল অনেক বেশি। এরমধ্যে  করোনাকালেই ব্যবহার বেড়েছে অন্তত ৩৫০ জিবিপিএস।  ইন্টারনেটের ব্যবহার বাড়লেও যন্ত্রপাতি ও মেশিনের সক্ষমতা সেই আগের মতোই। দেশের মানুষের ইন্টারনেট ব্যবহারের হার বাড়লেও বাড়েনি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা। ফলে ইন্টারনেট সেবাদান কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে আইএসপিগুলো অভিযোগ করছে।  তাদের দাবি, নিরাপদ ইন্টারনেট সেবাদান ও ইন্টারনেটকে ভার্চুয়াল দুনিয়ায় নিরাপদ রাখতে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর কোনও বিকল্প নেই।

ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি-ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে) সেবাদাতারা বলছেন, দেশের বাইরে থেকে ইন্টারনেট ডাটা (ব্যান্ডউইথ) পরিবহনের বিষয়টি ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের আওতাধীন টেলিযোগাযোগ অধিদফতর (ডিওটি-ডট) প্রতিষ্ঠিত ডিপিআই (ডিপ প্যাকেট ইন্সপেকশন)-এর মাধ্যমে নিতে হয়।  কিন্তু ব্যান্ডউইথের ব্যবহার বাড়লেও ডিপিআইয়ের সক্ষমতা সেই অনুপাতে না বাড়ায় শীর্ষস্থানীয় আইআইজিগুলোর সেবাদান কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, ডট প্রকল্পের মেয়াদেই ডিপিআইয়ের সক্ষমতা বাড়ালেও তা শেষ হয়ে যায়।  এখন সক্ষমতা বাড়ানোর আর জায়গা নেই।  সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন নতুন ডিপিআই অবশ্যই লাগবে।  এরইমধ্যে অনেক আইআইজি বাধ্য হচ্ছে ডিপিআইকে পাশ কাটিয়ে আইএসপিদের ইন্টারনেট সেবা দিতে।  যদিও সঠিক কোনও পরিসংখ্যান এ বিষয়ে পাওয়া যায়নি।  কিন্তু এতে করে যে উদ্দেশ্যে ডিপিআই স্থাপন করা হয়— তা ব্যাহত হতে পারে।  ডিপিআইয়ের সক্ষমতা না বাড়ানোর কারণে আইআইজিগুলো ব্যান্ডউইথের সক্ষমতা বাড়াতে পারছে না।

Advertisements

প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালে টেলিযোগাযোগ অধিদফতর (ডট) ডিপিআই প্রতিষ্ঠা করে।  দেশে ইন্টারনেটভিত্তিক অপরাধ দমন ও সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য এটি গড়ে তোলা হয়।  ২০১৯ সালে এ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়।  প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা থাকা সত্ত্বেও তা আর বাড়ানো হয়নি।  এই প্রকল্পের মেয়াদ আবারও বাড়ানো হবে বলে জানা গেছে।  এ-ও জানা গেছে, নুতন করে এ বিষয়ক নতুন যন্ত্রপাতি কেনা হতে পারে।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‌ডিপিআইয়ের সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ চলছে। এর কারণে গ্রাহকের সেবা পেতে যেন কোনও সমস্যা না হয়, সে বিষয়টি খেয়াল রাখা হচ্ছে।  আইএসপিগুলোও যেন নিরবচ্ছিন্নভাবে সেবা দিতে পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া আছে।‘

তিনি জানান, আমাদের সাবমেরিন ক্যাবলগুলোর ওয়েস্টে (পশ্চিমে- ইউরোপ অংশে) ট্রাফিক খুবই কম। এটা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। ক্যাপাসিটি আছে কিন্তু ব্যবহার করা হচ্ছে না।  দেশের ব্যান্ডউইথ পূর্বাংশ (সিঙ্গাপুর) নির্ভর।  ট্রাফিক বেশি।  তিনি আরও জানান, ফেসবুক, গুগল ইত্যাদির ডাটা সেন্টারগুলো সিঙ্গাপুর-নির্ভর।  ফলে এই দিকে ডাটা বেশি যায়।

শীর্ষস্থানীয় আইআইজি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান লেভেল-থ্রির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ জুনায়েদ বলেন, ‌‌আমরা বারবার বলছি, ডিপিআইয়ের ক্যাপাসিটি বাড়াতে। কিন্তু ডট থেকে এখন আর ক্যাপাসিটি বাড়ানো হচ্ছে না।  ডিপিআইতে এখন যে ন্যাশনাল ক্যাপাসিটি তার চেয়ে বেশি ব্যান্ডউইথ ওভার ফ্লো করছে। তাই কিছু কিছু আইআইজি ডাটাসেন্টার গেটওয়ে সাইটে ডিপিআই ওভার ফ্লো করছে।  কিন্তু ব্যান্ডউইথের চাহিদা এত বেড়ে গেছে যে, বড় আইআইজিগুলোর কিছু লিংক ডিপিআই সিস্টেমের বাইরে রাখতে হচ্ছে।‘

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বিটিআরসি, ডট-কে (ডিওটি) বলেছি ডিপিআই বাড়াতে।  তা না-হলে বিষয়টি নিরাপত্তা ইস্যু তৈরি করতে পারে।’  ডিপিআইয়ের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের নিজেদের কিছু করার নেই। এটা সম্পূর্ণভাবে মেইনটেইন করে ডট।  ফলে ডটকেই এর সক্ষমতা বাড়াতে হবে।  প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তা বাড়াতে হবে বা নতুন করে প্রকল্প শুরু করতে হবে।’ তিনি মনে করেন, সরকারের নিজের জন্যই এটা দ্রুত করা উচিত।  যত দেরি হবে তা দেশের অনলাইন দুনিয়া নিরাপত্তা সংকটে পড়ে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

আইআইজি (ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে) এবং এনটিটিএন (ভূগর্ভস্থ ক্যাবল নেটওয়ার্ক) সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ফাইবার অ্যাট হোমের চিফ টেকনোলজি অফিসার ও প্রযুক্তি বিশ্লেষক সুমন আহমেদ সাবির বলেন, ‘ডিপিআই’র  সক্ষমতা বাড়ানোর কথা, কিন্তু এখনও বাড়ানো হয়নি।  এর আগে যে ক্যাপাসিটি পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল, তাও অনেক আগেই অতিক্রম হয়ে গেছে।  এর ফলে সরাসরি গ্রাহক পর্যায়ে সমস্যা না হলেও সেবাদাতাদের (আইএসপি) সমস্যা হবে।  তারা ব্যান্ডউইথের ক্যাপাসিটি বাড়াতে পারছে না।’  কারণ চাইলে তিনি বলেন, ‘আইআইজি তা পারে, কিন্তু তা ডিপিআইয়ের মধ্যে দিয়ে যাবে না।  এজন্য গ্রাহকরা বাড়তি ব্যান্ডউইথ চাইলেও আইআইজিগুলো দিতে পারছে না ডিপিআইয়ের সক্ষমতার অভাবে। ফলে নতুন ডিপিআই লাগবেই।’

দেশের ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন আইএসপিএবির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদুল হক বলেন, ‘নতুন করে ডিপিআইয়ের সক্ষমতা বাড়াতেই হবে।  সক্ষমতা না বাড়ালে কেউ ডটের মধ্যে দিয়ে যাবে, কেউ বাইপাস করবে।  বাইপাস করলে আবার ডট ধরবে।  ফলে সক্ষমতা বাড়াতে নতুন যন্ত্রপাতি ও মেশিন কিনতেই হবে।  তা না-হলে বিষয়টি নিরাপত্তা ইস্যু তৈরি করতে পারে।’  তিনি মনে করেন, এবার অন্তত ১০ বছরের জন্য ডিপিআই বসানোর পরিকল্পনা করা উচিত।  প্রথমবার ডিপিআই স্থাপন করার তিন বছরের মধ্যে এর সক্ষমতা শেষ হয়ে গেছে।  এর থেকে শিক্ষা নিতে হবে।

ইমদাদুল হক জানান, অনেক আইআইজির সক্ষমতা শেষ হয়ে গেছে।  তার ব্যান্ডউইথ ক্যাপাসিটি বাড়াতেই হবে।  কিন্তু বাড়াতে পারছে না।  ফলে সংশ্লিষ্ট আইআইজিগুলো তার গ্রাহককে উন্নত সেবা দিতে পারবে না।  বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনলাইন মিটিং বাধাগ্রস্ত হবে, অনলাইনে শিক্ষার্থীদের ক্লাস করতেও সমস্যা হবে।  এখনও ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণে আছে।   ডিপিআইয়ের সক্ষমতা না বাড়ালে ইন্টারনেট দুনিয়া নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। বেড়ে যেতে পারে পর্নোগ্রাফি সাইটগুলোর উপস্থিতি, যা এখন নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আছে। আরও অনেক ধরনের সমস্যা তৈরি করতে পারে।  ফলে ডিপিআইয়ের সক্ষমতা বাড়ানোর কোনও বিকল্প নেই।

     এই বিভাগের আরও খবর দেখুনঃ