আজ ১৮ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২রা আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

অন্ধকারে আলোর সন্ধান করছেন স্বজনরা

অন্ধকারে আলোর সন্ধান করছেন স্বজনরা

চোখ বুজলেই সন্তানের লাশ দেখি। ঘুমাতে পারছি না। তাই রাতটা নির্ঘুম কেটেছে। জানি না আর কত রাত এভাবে জেগে থাকতে হবে। এভাবেই বলছিলেন নারায়ণগঞ্জে মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায় দগ্ধ শেখ ফরিদের (২১) বাবা কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ার কৃষক এমদাদুল হক। গতকাল রবিবার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পঞ্চম তলার ‘ওয়েটিং রুমে’ এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

এমদাদুল হক বলছিলেন, নিজে কৃষিকাজ করি। ছেলেকে লেখাপড়া শিখিয়ে স্বপ্ন দেখেছি সংসারের হাল ধরবে সে। স্বপ্নপূরণে ছেলে নারায়ণগঞ্জ ডিসি অফিসে চাকরি করছিল। সব কিছু ভালোই চলছিল। মসজিদের পাশেই বাসা নিয়ে থাকত। শুক্রবার এশার নামাজে গিয়ে দগ্ধ হয়ে এখন সব শেষ। কিছুটা থেমে চোখ মুছে তিনি বলতে শুরু করেন, আমি আশাবাদী। কী কারণে আশাবাদী জানতে চাইলে তিনি ফের বলতে শুরু করেন. আইসিইউতে ছেলেকে দেখতে গিয়েছিলাম। ছেলে আমার সঙ্গে কথা বলেছে। আমার কাছে খেতে চাচ্ছিল। স্যুপ খাইয়েছি। তাই অন্ধকারের মধ্যেও আলোর সন্ধান করছি আমি।

গত শুক্রবার নারায়ণগঞ্জ শহরের পশ্চিম তল্লা এলাকার বায়তুস সালাত জামে মসজিদে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় গতকাল পর্যন্ত মৃত্যু বেড়ে হয়েছে ২৬। এখনো চিকিৎসাধীন ১১ জন।

Advertisements

এমদাদুল হকের মতো অন্যদের পরিবারের সদস্যরাও বার্ন ইনস্টিটিউটের অপেক্ষায় আছেন স্বজনের ভালো খবর পাওয়ার জন্য। তাঁরা কখনো কখনো আহাজারি করছিলেন। তাঁদের চোখ হাসপাতালের পোস্ট আপারেটিভ ও হাই ডিপেনডেন্সি ইউনিটের (এইচডিইউ) দিকে।

কথা হয় দগ্ধ সিফাতের (১৮) বাবা মো. স্বপনের সঙ্গে। তিনিও গত দুই রাত নির্ঘুম কাটিয়েছেন। স্বপন বলছিলেন, জানি না ছেলের ভাগ্যে কী আছে।  সিফাত এবার তল্লা মডেল স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেছিল জানিয়ে তিনি বলেন, তাকে এইচএসসিতে ভর্তি করার চিন্তাভাবনা করছিলাম। নিয়মিত নামাজ পড়ত। শুক্রবার এশার নামাজ পড়ে বাসায় ফেরার কথা ছিল। আর ফিরবে কি না, খোদা জানেন।

শরীয়তপুরের নড়িয়ার আলাউদ্দিন শেখের ছেলে দগ্ধ ইমরানের (৩০) ছোট ভাই জাকির হোসেন বলেন, অপেক্ষায় আছি। ভাই আমার কত কষ্টই না পাচ্ছে। সহ্য করতে পারছি না। আশায় বুক বেঁধে আছি। ও সুস্থ হোক। ইমরান নারায়ণগঞ্জের ফকির নিট গার্মেন্টে কাজ করতেন। ভায়রা আমজাদের সঙ্গে ওই মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়ে তাঁরা দুজনই দগ্ধ হন। বিবাহিত ইমরানের একটি শিশুসন্তান রয়েছে। সেখানে চেয়ারে বসে জাকিরের মতোই অশ্রুসিক্ত শামীম আহমেদ। কথা বলতেই চোখ মুছে বললেন, আমার ভায়রা হান্নান মসজিদের আগুনে পুড়ে এখানে ভর্তি আছেন। নারায়ণগঞ্জ ফতুল্লার পশ্চিম তল্লার আফজালের ছেলে হান্নান। তাঁর এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছেন। মেয়ের বিয়ে হয়েছে। ছেলে এইচএসসিতে পড়ছে।

শামীম আহমেদ বলছিলেন, আগুনে হান্নানের শরীরের প্রায় ৮০ শতাংশই পুড়ে গেছে। বুকের কিছু অংশ ছাড়া পুরো শরীরেরই ব্যান্ডেজ। তাঁর অবস্থাও আশঙ্কাজনক।

দগ্ধদের মধ্যে বার্ন ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন ময়মনসিংহের ত্রিশালের আব্দুর রহমানের ছেলে ফরিদ (৫৫), পটুয়াখালীর চুন্নু মিয়ার ছেলে মোহাম্মদ কেনান (২৪), পটুয়াখালীর মোহাম্মদ রাজ্জাকের ছেলে নজরুল ইসলাম (৫০), একই এলাকার আব্দুল মান্নানের ছেলে আব্দুস সাত্তার (৪০), পটুয়াখালীর দুমকির চর বয়রা গ্রামের লতিফ হাওলাদারের ছেলে মামুন (২৩), শরীয়তপুরের নড়িয়ার কেদারপুর গ্রামের মনু মিয়ার ছেলে আব্দুল আজিজ (৪০) ও নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের বশিরহাট গ্রামের আব্দুল আহাদের ছেলে মো. আমজাদ (৩৭)।

দগ্ধদের মধ্যে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) আছেন ফরিদ, কেনান, আজিজ ও আমজাদ।

ইনস্টিটিউটের প্রধান সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, এখনো যাঁরা ভর্তি আছেন, তাঁরা কেউ শঙ্কামুক্ত নন। বিশেষ করে পাঁচজনের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ বলা যায়। তাঁরা আইসিইউতে আছেন।

মৃত্যু বেড়ে ২৬: দগ্ধ অবস্থায় যে ৩৭ জনকে বার্ন ইনস্টিটিউটে আনা হয়েছিল, তাদের মধ্যে আরো চারজন গতকাল মারা গেছেন। গত শনিবার রাত সাড়ে ১০টা থেকে গতকাল দুপুরের মধ্যে মারা যান জুলহাস উদ্দিন (৩০), শামীম হাসান (৪৫) ও মো. আলী মাস্টার (৫৫)। গত রাতে মারা যান বরিশালের বাকেরগঞ্জের আবুল বাশার মোল্লা (৫১) এবং একই উপজেলার বারঘড়িয়া গ্রামের সোবাহান ফরাজীর ছেলে মনির ফরাজী (৩০)। তাঁদের নিয়ে গত রাত পর্যন্ত এই ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৬ হয়েছে।

জুলহাস উদ্দিনের আগে এই আগুনে দগ্ধ হয়ে তাঁর সাত বছর বয়সী ছেলে জুয়েলের মৃত্যু হয়। ছেলের লাশ নিয়ে গতকাল পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী এলাকার বাড়িতে পৌঁছতেই জুলহাসের মৃত্যুর খবর পান স্ত্রী রহিমা বেগম। মো. আলী মাস্টারের ছেলের বউ জান্নাতুল ফেরদৌসি বলেন, তাঁর শ্বশুর আজ (রবিবার) সকালে মারা গেছেন। তিনি জানান, বায়তুস সালাত জামে মসজিদের কাছেই তাঁদের বাড়ি। তাঁর শ্বশুর ওই মসজিদেই নিয়মিত নামাজ পড়তেন। আগুনে তাঁর পোশাক পুড়ে শরীরও দগ্ধ হয়। ওই অবস্থায় তিনি বাসায় ফিরে মেয়ের কাছে লুঙ্গি চান। এমন পরিস্থিতি দেখে ছেলে রাসেল বাবাকে সরাসরি শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটে নিয়ে আসেন।

গতকাল দগ্ধদের অবস্থার খোঁজখবর নেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। সে সময় আইসিইউতে থাকা ছয়জনসহ ১৩ জনের সবাইকে সারিয়ে তোলাই তাঁদের সর্বাত্মক চেষ্টা থাকবে বলে জানান মন্ত্রী। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমানও। তিনি জানান, নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে ২০ হাজার ও দগ্ধদের প্রত্যেকের পরিবারকে আপাতত ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। কারো চিকিৎসার জন্য যদি কোনো ওষুধ বা টাকা-পয়সার প্রয়োজন থাকে, তাহলে তাঁরা ডা. সামন্ত লাল সেনের সঙ্গে যোগাযোগ করে সহায়তা নিতে পারবেন।

প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, আমরা আন্ত মন্ত্রণালয় সভা ডাকব। সেখানে সিদ্ধান্ত হবে হতাহতদের পরিবারকে কী পরিমাণ সহায়তা দেওয়া হবে। এ জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নেব।

এ ছাড়া গতকাল দগ্ধদের দেখতে শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটে যান গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। নারায়ণগঞ্জের মতো বড় শহরে ভালো চিকিৎসাসুবিধা না থাকায় হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, সরকার হাজার হাজার কোটি টাকার মেগা প্রজেক্ট করছে। কিন্তু একটা কিছু হলেই এখনো ঢাকায় আসতে হচ্ছে। প্রতিটি জেলায় বার্ন ইউনিট থাকতে হবে। এটা আইসিইউর চেয়েও বেশি দরকার। সব চিকিৎসককে পোড়া রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত বলেও মনে করেন তিনি।

     এই বিভাগের আরও খবর দেখুনঃ